গৃহকর্মী রাখার আগে করনীয় কী।

গৃহকর্মী/ গৃহপরিচারিকা/ ছুটা বুয়া, গাড়ী চালক/ ড্রাইভার, গৃহশিক্ষক/ গৃহশিক্ষিকা রাখার পূর্বে সচেতন থাকুন!

date-20-08-2021.

গৃহকর্মী রাখার আগে করনীয় কী।



গৃহকর্মী রাখার আগে করনীয় কী?

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কতিপয় গৃহকর্মী/ গৃহপরিচারিকা/ ছুটা বুয়া, গাড়ী চালক/ ড্রাইভার, গৃহশিক্ষক/ গৃহশিক্ষিকার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবারে বিভিন্ন সময় অপরাধের ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা যাচ্ছে। 

তাই এসব বিষয়ে কিভাবে সচেতন থাকবেন বা কিভাবে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে মুক্ত থাকবেন, সেই বিষয়ে এই পোস্টে কিছু সচেতনতামূলক তথ্যাদি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশাকরি পোস্টটি পড়ে উপকৃত হবেন।

আধুনিক সমাজে সময়ের সাথে মানুষের জীবন যাত্রার মান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজনের রোজগারে বা আয়ের উপর একটি সংসারের সকল ব্যয়ভার বহন করা প্রায় কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। 

তাই পরিবারের বাড়তি ব্যয় মিটাতে বেশিরভাগ শহুরে পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়ে চাকরি কিংবা ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে। ফলে ঘরের বা বাসার কাজে এবং সন্তান লালন-পালনে কিছুটা শূণ্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। 

তাই ঘরের বা বাসার কাজ করার জন্য কিংবা সন্তানের দেখা-শুনা করার জন্য বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ পরিবারে গৃহকর্মী/ গৃহপরিচারিকা নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি যাদের ব্যক্তিগত গাড়ী রয়েছে তারা গাড়ীর চালকও নিয়োগ করে থাকে। 

শহরাঞ্চলগুলিতে গৃহপরিচারিকার চাহিদা দিন দিন ব্যাপক হওয়ায় এবং চাহিদামত গৃহপরিচারিকা না পাওয়ায় অনেকে যাকে-তাকে সঠিক পরিচয় না জেনে গৃহপরিচারিকা হিসাবে নিয়োগ করে থাকে। আবার অনেকে ছুটা বুয়া হিসাবে খণ্ডকালীন গৃহপরিচারিকাও নিয়োগ করে থাকে। 

মাঝে মাঝে অচেনা ও অপরিচিত কতিপয় গৃহপরিচারিকা কিংবা ছুটা বুয়া/ গৃহকর্মী পরিবারের জন্য বড় ধরণের বিপদের কারণ হয়। কারণ অচেনা ও অপরিচিত গৃহপরিচারিকার মধ্যে ছদ্মবেশে কেউ কেউ সংঘবদ্ধ চোর কিংবা ডাকাত চক্রের সদস্য হয়ে থাকে। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘটিত অপরাধের সংবাদের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, কতিপয় গৃহপরিচারিক কিংবা ছুটা বুয়ার পাশাপাশি নিয়োগকৃত কতিপয় গাড়ী চালক কিংবা কতিপয় গৃহ শিক্ষক/ গৃহ শিক্ষিকাও ছদ্মবেশে এই ধরণের চোর/ডাকাত চক্রের সদস্যদের সাথে যুক্ত থাকে। 

ইতিমধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার সংবাদের বদৌলতে জানা যায় যে, বিভিন্ন স্থানে তথা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে নিয়োগকৃত গৃহপরিচারিকা/ ছুটা বুয়া কয়েক দিন কাজ করার সুবাদে বাসার কোথায় কি কি রাখা আছে, কোন কোন সময় বাসায় কেউ থাকেনা, পরিবারের আয়-ব্যয়ের উৎস কি ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে এবং সুযোগ বুঝে ঐ পরিবারে চুরি কিংবা ডাকাতি সহ বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকে। 

তাই কাউকে স্বল্প সময়ের পরিচয়ে অন্ধবিশ্বাস বা অতিরিক্ত বিশ্বাস করা উচিত নয়। গৃহপরিচারিকা/ গৃহকর্মী/ ছুটা বুয়া, গাড়ী চালক, গৃহ শিক্ষক বা গৃহ শিক্ষিকা যাকেই নিয়োগ করেন না কেন, তার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ইত্যাদি সংগ্রহ করে রাখুন। 

নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের প্রদত্ত তথ্যাদি সঠিক কিনা তাও যাচাই- বাছাই করে নিন এবং তাদের গতিবিধি প্রতিনিয়ত নজরে রাখার চেষ্টা করুন।

আশার সংবাদ হলো, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের যুগোপযোগী উদ্যোগ নাগরিক তথ্য ফরম বা নাগরিক পরিচিতি ফরম এর মাধ্যমে থানা এলাকায় বসবাসকারী সকল নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ পূর্বক একটি নির্ধারিত অনলাইন ডাটাবেজে সংরক্ষণ করছে। 

তাই আপনিও আপনার পরিবার সহ আপনার বাসা/বাড়ীতে নিয়োগকৃত গৃহকর্মী/ গৃহপরিচারিকা/ ছুটা বুয়া, গাড়ী চালক/ ড্রাইভার, গৃহ শিক্ষক/ গৃহ শিক্ষিকা সকলের তথ্য পুলিশ কর্তৃক সরবরাহকৃত নির্ধারিত নাগরিক পরিচিতি ফরম”-এ বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে বা যথাযথভাবে ফরম পূরণ করে নিকটস্থ থানায় জমা দিন। 

নাগরিক পরিচিতি ফরম পূরণ করে থানায় জমা দেয়া এবং ফটোকপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখার একটি বড় সুফল হলো, কোন কারনে কেউ যদি অদূর ভবিষ্যতে কোন অপকর্ম করে তাকে সহজে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। অন্যদিকে পুলিশের নিকট নাম-ঠিকানা সংগ্রহে থাকায় অনেকে অপরাধ করতে সাহস করে না।


একটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরা হলো- 

নগরীর অভিজাত এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাড়ীতে বসবাস করেন প্রবীন এক ডাক্তার ও ডাক্তারের অসুস্থ্য স্ত্রী। বাসায় আর কেউ না থাকায় একটি মহিলাকে খণ্ডকালীন কাজের বুয়া বা গৃহপরিচারিকা হিসাবে বা গৃহ পরিচারিকা হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ডাক্তার সাহেবের ব্যক্তিগত গাড়ী চালানোর জন্য একজন চালকও নিয়োজিত আছে। 

নিয়োগকৃত কাজের বুয়া কয়েক দিন বেশ ভাল ভাবেই মনযোগ দিয়ে বাসার কাজ করছে। ডাক্তার দম্পতির সকাল বেলার নাস্তা তৈরী, কাপড় ধোয়া, রান্না ইত্যাদি কাজ বেশ ভালভাবে করে যাচ্ছে। সেই গৃহপরিচারিকা কয়েকদিনের কাজে ডাক্তার ও ডাক্তার সাহেবের স্ত্রীর মনও যুগিয়েছে। গৃহপরিচারিকা বাসায় কাজের পাশাপাশি ডাক্তার দম্পতির অগোচরে সুযোগ বুঝে বাসার কোথায় কি রাখা আছে, বাসায় কখন কে কে আসা-যাওয়া করে তাও দেখে নেয়। 

এভাবে প্রায় ৫/৬ দিন যাওয়ার পর কাজের বুয়া সকালের নাস্তার সাথে চেতনা নাশক ঔষধ মিশিয়ে ডাক্তার ও ডাক্তার সাহেবের স্ত্রীকে খেতে দেয়। ডাক্তার দম্পতি সরল বিশ্বাসে কাজের বুয়ার দেয়া নাস্তা খাওয়ার কিছু সময় পর ডাক্তার ও ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী উভয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। 

এরপর কাজের বুয়া ডাক্তার সাহেবের বাসার ভেতর থাকা মোবাইল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান মালামাল চুরি করে পালিয়ে যায়। 

চেতনা নাশক ঔষধ খাওয়ানোর একদিন পরেও তাদের জ্ঞান ফিরে আসে নাই। ইতিমধ্যে ডাক্তার দম্পতির মেয়ে মা ও বাবা উভয়ের মোবাইলে ফোন করে ফোন বন্ধ পাওয়ায় স্থানীয় একজন পরিচিতি লোককে উক্ত বাসায় পাঠায়। 

স্থানীয় পরিচিত লোক মারফত ডাক্তার সাহেবের মেয়ে সংবাদ পান যে, ডাক্তার দম্পতি অজ্ঞান অবস্থায় বাসায় পড়ে আছেন, বাসার দরজা খোলা। 

এরপর ডাক্তার দম্পতিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালে ভর্তির প্রায় ১/২ দিন পর তাদের জ্ঞান ফিরে। 

এই ঘটনার পর বিস্তারিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে থানায় মামলা রুজু হয়। মামলা রুজু হওয়ার বেশ কিছুদিন পর থানা পুলিশ ঘটনায় জড়িত কাজের বুয়াকে আটক করে। 

কাজের বুয়াকে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে ডাক্তার সাহেবের ব্যক্তিগত গাড়ী চালকও কাজের বুয়ার সাথে ঘটনায় জড়িত। কাজের বুয়া এবং ব্যক্তিগত গাড়ী চালক উভয়ে পরষ্পর যোগসাজসে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। 

এই ধরণের বহু ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। কিন্তু সচেতন হচ্ছে কয় জনে  ?

বর্তমান সময়ে নিরাপদ থাকতে করণীয় কী ?

১। বাসা/বাড়িতে কাউকে গৃহপরিচারিকা/ গৃহকর্মী/ ছুটা বুয়া হিসাবে নিয়োগ করার সময় নাম, স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি সংগ্রহ করে রাখা। তাদের প্রদত্ত তথ্যাদি সঠিক কিনা তাও যাচাই করা।

২। গাড়ীর চালক/ ড্রাইভার, গৃহ শিক্ষক/ গৃহ শিক্ষিকা নিয়োগ করার সময় (যদি অপরিচিত কেউ হয়) নাম, স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি সংগ্রহ করে রাখা। তাদের প্রদত্ত তথ্যাদি সঠিক কিনা তাও যাচাই করা।

৩। বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক পরিচালিত নাগরিক পরিচিতি ফরম” সংগ্রহ পূর্বক যথাযথভাবে পূরণ করে নিকটস্থ থানায় জমা দেয়া এবং ফটোকপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখা।

৪। নিয়োগকৃতদের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যালোচনায় রাখার চেষ্টা করা। সহজে কাউকে অতিরিক্ত বিশ্বাস না করা।

৫। সম্ভব হলে বাসায় কিংবা বাড়ীর মালিককে বলে বাসার আশপাশে সিসি ক্যামেরা সংযোগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৬। যেই থানা এলাকায় বসবাস করা হয় সেই থানার নির্ধারিত একটি মোবাইল/টেলিফোন নম্বর (ডিউটি অফিসার) এবং এলাকা ভিত্তিক থানার বিট অফিসারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহে রাখা। 

৭। বিশেষ জরুরী প্রয়োজনে জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ কল করার বিষয়টি মনে রাখা। 

মনে রাখবেন সচেতনতাই সমাধান। মূল কথা হলো, সবাই খারাপ নয়, কতিপয় খারাপ মানুষের কারনে ভাল মানুষদেরকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আবার কে খারাপ কিংবা কে ভাল তা কারো চেহারা ও আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই। 

তাই কাউকে ব্যক্তিগত কাজে নিয়োগ করার পূর্বে সচেতনতা মূলক উল্লেখিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কিছুটা নিরাপদ বা নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব। 

নিজে সচেতন থাকুন, অন্যকে সচেতন করতে পোস্টটি শেয়ার করুন।

ধন্যবাদ। 

আরো দেখুন-

নাগরিক পরিচিতি ফরম কেন প্রয়োজন।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কি জেনে রাখুন।

Comments

Popular posts from this blog

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কি জেনে রাখুন।

ফেসবুক বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কি করবেন।

দুঃখ সত্যকে প্রজ্ঞার চোখে জানা।