মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে সচেতনতা ও করণীয় কি।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা জালিয়াতি ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কারণ কি ? 
মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে সচেতনতা ও করণীয় কি ?

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা জালিয়াতি ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কারণ কি। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে সচেতনতা ও করণীয়।


মোবাইল ব্যাংকিংঃ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস “নগদ” তথা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে প্রায় ০১ কোটি ৪০ লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের মোবাইলে উপবৃত্তির টাকা প্রেরণ করা হয়।কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেয়া এই উপবৃত্তির টাকা নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।  

এই জালিয়াতি সম্পর্কে জানতে হলে আগে জানতে হবে মোবাইল ব্যাংকিং কি ? 

মোবাইল ব্যাংকিং হচ্ছে কোন ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত দূরনিয়ন্ত্রণ আর্থিক লেনদেন সেবা। যা কোন ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকদের ব্যাংকে বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি না গিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূরনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেন পরিচালনার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। 

ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি সাধারণ কীপ্যাড ফোন/ফিচার বা নরমাল মোবাইল ফোনের পাশাপাশি এন্ড্রয়েড/ স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন এ্যাপস ভিত্তিক আর্থিক লেনদেন সেবা প্রদান করে থাকে। 

এই মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ব্যাংকে বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে টাকা পাঠানো, নগদ টাকা উত্তোলন, বিভিন্ন বিল পরিশোধ, ফি প্রদান, মোবাইলে টাকা লোডসহ ইত্যাদি আর্থিক লেনদেনের কাজ করা হয়ে থাকে। 

বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন তথা মোবাইল ব্যাংকিং এর যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ডাচ্ বাংলা ব্যাংক ২০১১ সালের ৩১শে মার্চ বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা চালু করে। 

বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এর মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে ব্রাক ব্যাংকের “বিকাশ”, ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের “রকেট”। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস “নগদ” এর জনপ্রিয়তাও লক্ষ করা যাচ্ছে। তাছাড়াও বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন নামে এই ধরণের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে।

এই মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পরিচালনার জন্য মোবাইল নাম্বার, ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে একটি একাউন্ট খুলতে হয়। এই ক্ষেত্রে ব্যাংকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত একাউন্ট না থাকলেও চলে। 

মোবাইল নাম্বার ও ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে একাউন্ট খোলার সময় একটি চার বা ছয় ডিজিট বা অংকের পিন কোড প্রদান করতে হয়। 

একাউন্টে টাকার পরিমাণ দেখা, টাকা পাঠানো, নগদ টাকা উত্তোলন, বিল প্রদান, ফ্রি প্রদান, মোবাইলে টাকা লোডসহ মোবাইল ব্যাংকিং এর  বিভিন্ন সেবা নেয়ার সময় এই পিনকোড বা পাসওয়াড প্রদান করতে হয়।   


সাধারণ মানুষ কেন প্রতারিত হচ্ছে ?

মোবাইল ব্যাংকিং একটি ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন পদ্ধতি। যারা মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা ব্যবহার করছে তাদের সবার মধ্যে ডিজিটাল প্রতারনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারনা নেই। 

এই ক্ষেত্রে কাস্টমার কেয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত যেকোন সমস্যা নিয়ে কাস্টমার কেয়ার গ্রাহকদের সহায়তা প্রদান করে থাকে।

কাস্টমার কেয়ারের আবার নির্ধারিত একটি ছোট নাম্বার থাকে। যেই নাম্বারে ফোন দিয়ে কাস্টমার কেয়ারের সেবা নেয়া যায়। কাস্টমার কেয়ারে যারা সেবা প্রদান করেন তারা খুবই বিনয়ী, আন্তরিক ও মিষ্টভাষী হয়ে থাকে। যার ফলে গ্রাহকের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বিনয়ী ও মিষ্টভাষী কথায় গ্রাহক মানসিক প্রফুল্লতা ও প্রশান্তি পায়।

সেই সুযোগটিই নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতারক চক্র। প্রতারক চক্র সহজ সরল মানুষকে কাস্টমার কেয়ারের ক্লোনিং করা নাম্বার হতে ফোন দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে বা প্রলোভিত করে গ্রাহকের চার বা ছয় ডিজিটের পিনকোড বা পাসওয়াডটি নিয়ে নেয়। এর কিছু সময় পর দেখা যায় গ্রাহকের মোবাইল ব্যাংকিং এর একাউন্টের ব্যালেন্স জিরো (জমা টাকা নেই)।

এক্ষেত্রে যে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে তা নয়। অনেক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও প্রতারকের মিষ্টি কথার ফাঁদে বা তাতক্ষণিক কাস্টমার কেয়ারের লোক মনে করে কথা বলে প্রতারিত হচ্ছে।

মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস বিকাশ এর অনেক ব্যক্তিগত ব্যবহারকারী এমনকি এজেন্টও এই ধরণের প্রতারণার সম্মুখিন হয়েছে এবং হচ্ছে। কাউকে ব্যক্তিগত পিনকোড শেয়ার না করা বা পিনকোড না জানানোর জন্য প্রতিনিয়ত বিকাশ ও অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকদের সচেতন করছে। বিকাশে কেউ এই ধরণের প্রতারণার ঘটনা ঘটলে বিকাশ কাস্টমার কেয়ার প্রতারকের একাউন্টের ব্যালেন্স ট্রান্সফার বা ক্যাশ ইন বন্ধ করে দিয়ে থাকে। 

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা নিয়ে জালিয়াতির ঘটনায় ডাক বিভাগের “নগদ” স্বউদ্যোগে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনেক প্রতারক বর্তমানে পুলিশ কর্তৃক আটক হয়েছে। 

বিকাশ প্রতারণার ক্ষেত্রে বিকাশ কর্তৃক এই ধরণের পদক্ষেপ নিতে তেমন একটা দেখা যায়নি। সেইক্ষেত্রে ডাক বিভাগের নগদ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ প্রদান করতে হবে।


এই ধরণের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি ?

তালা-চাবির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। আমরা নিজ নিজ বাসা-বাড়ী, দোকান-পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় কিংবা মূল্যবান মালামাল সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রকার শক্তপোক্ত তালা (Lock) ব্যবহার করি। মূল্যবান মালামাল চুরির ভয়ে এই তালার চাবি (Key) আমরা অন্য কাউকে প্রদান করি না এবং খুবই যত্নসহকারে গোপনীয়ভাবে সুরক্ষা করি।

বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম বা একাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সুরক্ষার জন্য এই ধরণের একটি কাল্পনিক তালা (Lock) ব্যবহার করা হয়, যাকে পাসওয়াড (Password) বা পিনকোড (Pincode) বলা হয়। ডিজিটাল (Digital) মাধ্যম ভেদে এই পাসওয়াড বা পিনকোড বিভিন্ন অংকের হয়ে থাকে। 

ব্যাংক একাউন্টের ভিসা (Visa) বা মাস্টার কার্ড দিয়ে এটিএম (ATM) বুথ হতে টাকা উত্তোলন এবং বিকাশ, নগদ সহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের সময় চার থেকে ছয় ডিজিটের পিনকোড একাউন্ট এর তালার চাবি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। 

তাই এই পিনকোড কাউকে জানিয়ে দিলে সেই একাউন্ট আর সুরক্ষিত থাকে না। তাই এজেন্ট, কাস্টমার কেয়ার কিংবা পরিচিত কোন ব্যক্তি ফোন করে যত তাড়াহুড়া করুক, একাউন্ট ব্যালেন্সের কি অবস্থা জিজ্ঞাসা করুক, একাউন্টের টাকা চলে যাওয়া কিংবা কম থাকার কথা বলুক কিংবা বিভিন্ন রকম প্রলোভন দিক কোন অবস্থাতেই নিজের পিনকোড কাউকে বলা যাবে না কিংবা কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না। পিনকোড কোন অবস্থায় কোন কেউ দাবী করতে পারে না, এটা শুধুমাত্র গ্রাহকের ব্যক্তিগত বিষয়। 


একাউন্ট সুরক্ষায় লক্ষ্যণীয় কিছু বিষয় ঃ

  • কাউকে নিজের একাউন্টের পিনকোড জানানো যাবে না বা শেয়ার করা যাবে না।
  • প্রতারকরা খুবই মিষ্টি ভাষায় বিনয়ের সাথে গ্রাহকের একাউন্টের বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে একাউন্টের তথ্য নিতে চায়, তাই এইক্ষেত্রে সাবধান থাকুন।
  • কারো প্রলোভনে আকৃষ্ট হওয়া যাবে না। 
  • মনে রাখবেন পিনকোড বা পাসওয়াড ব্যক্তিগত সম্পত্তি এটি কারো সাথে শেয়ারযোগ্য নয়।
  • কখনো মোবাইল ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ব্যক্তিগত পিনকোড দাবী করে না। তাই কাস্টমার কেয়ারের নামে কেউ পিনকোড দাবী করলে সাবধানতা অবলম্বন করুন।

মোবাইল ব্যাংকিং-এ প্রতারিত হলে কি করবেন ?

সহজ সরল গ্রাহকরা প্রতারকের মিষ্টি কথায় প্রতারণার ফাঁদে পরে থাকে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাউকে সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। এতকিছুর পরেও প্রতারণার স্বীকার হলে তাৎক্ষনিক নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে এবং কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে প্রতারণার বিষয়টি জানাতে হবে। 

#পোস্টটি ভাল লাগলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

ধন্যবাদ। 

Comments

Popular posts from this blog

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কি জেনে রাখুন।

ফেসবুক বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কি করবেন।