গিফট বক্স বা অনলাইনে প্রতারণার শিকার হলে কি করবেন।

গিফট বক্স প্রতারণা হতে সাবধান!

ফেসবুকে কিছুদিনের পরিচয়ের পর গিফট পাওয়ার প্রতারণার ফাঁদে পা দিবেন না।

Date-09/03/2021, 09:52PM



দিন দিন নিত্য নতুন প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে অনেকে। প্রতারণার ফাঁদে ফেলার বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে ফেসবুক এবং অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নিচ্ছে অনেকে। অনেক বিদেশী ফেসবুক ব্যবহারকারী বাংলাদেশীদের ফেসবুক বন্ধু হচ্ছে। সেই বিদেশী বন্ধু কিছুদিন পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও বৃত্তবান দাবী করে বাংলাদেশী সহজ সরল ফেসবুক বন্ধুকে আশ্বস্ত করে এবং কিছু দিন পর গিফট বা ডলার পাঠিয়ে বন্ধুত্বকে পরিপক্ক করার চেষ্টা করে। এই ফাঁদে পড়েন অনেক বাংলাদেশী ফেসবুক ব্যবহারকারী। 

আজকে এই বিদেশী ফেসবুক বন্ধুর প্রতারণার বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। যাতে ভবিষ্যত অনাকাঙ্খিত প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আশাকরি শেষ পর্যন্ত সাথে থাকবেন। আপনার প্রয়োজন না হলেও আপনার আশপাশের কারো প্রয়োজন হতে পারে। 

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেনা বা ইন্টারনেটে বিভিন্ন কিছু সার্চ করেনা তেমন লোক কমই আছে। আধুনিক সভ্যতার যুগে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া বড়ই বেমানান লাগে। দূর-দূরান্তের মানুষের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনে অধিকাংশ মানুষ অনলাইন ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলি প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে আসছে। 

প্রতিদিন কোথায় যাচ্ছে, কি কি করছে, কার কার সাথে চলাফেরা করছে তার ছবি প্রতিনিয়ত সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড ও শেয়ার করা হচ্ছে। সরল বিশ্বাসে আপলোড ও শেয়ার করা ছবি দেখে একজন মানুষের অবস্থান সবাই জেনে যাচ্ছে। সেই সুযোগ নিচ্ছে কিছু স্বার্থান্বেষী অসাধু লোকজন।

বেশ কয়েক বছর যাবৎ পূর্বের তুলনায় অধিকহারে ফেসবুক, টুইটার, ইমেইল ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশী ব্যক্তির সাথে বিদেশী ব্যক্তির বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক তৈরী হচ্ছে। কিছুদিনের সম্পর্কের সুবাদে কতিপয় বিদেশীরা বাংলাদেশীদের বন্ধুত্বের প্রতিদানে মূল্যবান গিফট সামগ্রী পাঠাবে বলে বাংলাদেশী ফেসবুক বন্ধুকে জানায়। সহজ সরল বাংলাদেশী ফেসবুক ব্যবহারকারী সেই প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়।  

বাংলাদেশের অনেকে অল্প দিনের বিদেশী ফেসবুক বন্ধু কর্তৃক গিফটের কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং সেই গিফট পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। এসব প্রতারকদের সিন্ডিকেট থাকে বিদেশে ও বাংলাদেশে। গিফট পাঠানোর কথা জানানোর কয়েক দিন পর একটি ম্যাসেজ আসে এবং অনেক সময় মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানায় গিফট বাংলাদেশে এসেছে। যার নামে গিফট আসছে সেতো মহা খুশি। 

যখনই গিফটটি কাস্টম কর্তৃক টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলে ফোন করা হয় তখনই শুরু হয় আসল খেলা। অনেক সময় গিফটটি কাস্টম থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য কল দেয় এবং আরো বলে যে, একটি ব্যাংকে গিফট বক্সটি ছাড়িয়ে নেয়ার খরচ বাবদ মোটা অংকের টাকা জমা দিতে হবে। অনেকে মহামূল্যবান গিফট বক্সটি ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য চাহিদা মত টাকা বিকাশ, ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। 

এরপর গিফট বক্স নিয়ে বিভিন্ন তালবাহানা শুরু হয় এবং কয়েক দফায় বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। আবার অনেকে বিপুল অংকের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে না চাইলে গিফট বক্সে অবৈধ জিনিস আসে বলে জানায় এবং গিফট বক্সে থাকা অবৈধ জিনিসের কারনে আইনের আওতায় আনার ভয় দেখায়। অনেকে ভয় পেয়ে বিপুল অংকের টাকা দিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন অনেক বাংলাদেশী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী এই ধরণের প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। কিন্তু সচেতন হচ্ছেন কজনে ? অনেকে মান সম্মানের ভয়ে তা প্রকাশও করছে না।

প্রতারণা থেকে সৌভাগ্য ক্রমে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশী এক যুবকের সংক্ষিপ্ত গল্প-

কিছুদিন পূর্বে ফেসবুক মাধ্যমে বাংলাদেশী এক যুবকের সাথে পরিচয় ঘটে এক বিদেশীর। সেই বিদেশী নাগরিক নিজেকে বিদেশী সামরিক বাহিনীর অফিসার দাবী করে এবং শান্তিরক্ষী হিসেবে আফ্রিকার এক দেশে কর্মরত আছে মর্মে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দিয়ে আশ্বস্থ করে। সেই বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশী যুবকের মোবাইল ও ইমেল নাম্বার সংগ্রহ করে ইমেইলে ম্যাসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকে। 

একপর্যায়ে সেই বিদেশী বন্ধু জানায় যে, সে ও তার সঙ্গীদের সাথে সন্ত্রাসীদের বন্ধুক যুদ্ধের পর সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ ডলার পায়। উক্ত ডলারের মধ্যে উক্ত বিদেশীর ভাগে পাওয়া প্রায় এক মিলিয়ন ডলার সে তাৎক্ষণিক নিজ দেশে প্রেরণ করতে না পারায় বাংলাদেশী যুবকের নিকট রাখতে চায়। বছর খানেক পর সেই বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে এসে ডলার ফিরিয়ে নিবে এবং তার বিনিময়ে ৩০% বাংলাদেশী যুবককে দিয়ে যাবে। 

হয়ে গেলো খুশিতে আত্মহারা। এর ৩/৪ দিন পর বাংলাদেশী যুবকের নিকট কল আসে আপনার নামে একটি পার্সেল এসেছে, তার জন্য ফি বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে হবে। এই বিষয়টি শোনার পর বিশ্বস্থ বন্ধু মহলে শেয়ার করায় সেই বাংলাদেশী যুবক প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পায়। এরকম প্রতারিত হয়ে বিপুল অংকের টাকা হারানোর বহু উদাহরণ আছে। তাই সময় থাকতে সচেতন হোন।

একবার নিজের বিবেক খাটিয়ে চিন্তা করুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছুদিনের পরিচয়ে বিদেশী বন্ধু কেন আপনাকে গিফট প্রেরণ করবে ? 
কেনইবা প্রেরণ করবে ? 
তার স্বার্থ কি ?

প্রতারণা থেকে বাঁচতে করণীয়ঃ-

  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ফেসবুকে কোন বিদেশী বন্ধু ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে তার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার আগে তার প্রোফাইল চেক করে নিন।
  • বিদেশী প্রোফাইলের কেউ ফেসবুকে বন্ধুত্ব হওয়ার সাথে সাথে জিমেইল/ হোয়াটসএ্যাপ নাম্বার চাইলে সতর্ক থাকুন। জিমেইল/ হোয়াটসএ্যাপ নাম্বার দিলেও কথাবার্তা ও ম্যাসেজ আদান প্রদানে সতর্ক থাকুন।
  • অল্প দিনের পরিচয়ে বিদেশী প্রোফাইলের কোন বন্ধু গিফট বা ডলার পাঠানোর কথা বললে আরো বেশি সচেতন থাকুন।
  • গিফট বক্স পাঠানোর কথা বলার কয়েক দিন পর বাংলাদেশের কোন মোবাইল নাম্বার থেকে আপনার মোবাইল নাম্বারে ফোন করে গিফট বক্স বা পার্সেল ছাড়ানো বাবদ টাকা দাবী করলে কিংবা ব্যাংক একাউন্টে টাকা জমা দেয়ার কথা বললে সাবধানতা অবলম্বন করুন। পরিবারের লোকজন কিংবা নিকট আত্মীয়-স্বজনকে বিষয়টি অবগত করুন এবং প্রয়োজনে এই বিষয়ে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।
  • লোভের বশে কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রতারকের ফাঁদে পড়ে ব্যাংকে কিংবা বিকাশে ভুয়া গিফট বক্স বা পার্সেল ছাড়ানোর জন্য প্রতারকের ফাঁদে পড়ে টাকা দিবেন না। 
  • জরুরী প্রয়োজনে বাংলাদেশ পুলিশের জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ এর সহায়তা গ্রহণ করুন।       
  • সহজে কাউকে বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় এবং পরিচয়ের সূত্র ধরে গিফট প্রেরণ করার কথা বললে অথবা অচেনা কেউ ফোন করে লক্ষ লক্ষ টাকার পুরষ্কার দেওয়ার কথা বললে সরাসরি নিকটস্থ থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করুন। বর্তমান সময়ে কাউকে বিশ্বাস করার পূর্বে চিন্তা করুন, সে বিদেশী হোক আর বাংলাদেশী হোক। 

#আমার লেখা ভাল লাগলে শেয়ার করতে অনুরোধ করা হলো।  

ধন্যবাদ।  

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কি জেনে রাখুন।

মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে সচেতনতা ও করণীয় কি।

ফেসবুক বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কি করবেন।