সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কেনার সময় করণীয় কী।

সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কেনার সময় সচেতন থাকুন। 

সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কেনার সময় সচেতন থাকুন।


সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনবেন ভাবছেন ? লিখাটি একবারের জন্য হলেও পড়ে দেখুন কাজে আসতে পারে। 

সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল দামে সস্তা হওয়ায় কেউ কেউ সেকেন্ড হ্যান্ড বা অন্যের ব্যবহৃত মোবাইল বা পুরাতন মোবাইল কিনে থাকে। এই পুরাতন মোবাইল কেনার কারণে আবার কাউকে কাউকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। 

সেই সব বিষয়ে আজকে বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য এই কন্টেন্টটি লিখা, আশা করি এটি আপনার ও আপনার পরিচিত জনদের প্রয়োজনে আসবে। 

মানুষের জীবন যাত্রার মান দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মোবাইল ফোন অতিব প্রয়োজনীয় একটি যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন না থাকলে যেন আজকাল চলা যায় না। মনে হয় ব্যক্তি জীবনে কি যেন অপূরণ রয়েছে। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন নেই এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আগেকার দিনে এনালগ মোবাইল বা ফিচার মোবাইল বা কীপ্যাড মোবাইলের প্রচলন ছিল, বর্তমানেও অনেকের কাছে এসব ফিচার ফোন আছে। 

তবে বেশ কয়েক বছর যাবৎ এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বা টার্চ স্ক্রীন মোবাইল ফোন ফিচার ফোনের বাজার দখল করেছে। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যথাক্রমে- ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারসহ ইন্টারনেট ব্রাউজ করার জন্য বর্তমানে টার্চ স্ক্রীন মোবাইল বা এন্ড্রয়েড মোবাইল খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আবার করোনা মহামারীর (Covid-19) কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরে বসে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার জন্য এন্ড্রয়েড ফোন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

চাহিদার তুলনায় যোগান সীমিত হওয়ায় অনেকে অধিক মূল্যে নতুন এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনতে পারে না। কম দামে নতুন এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনলেও তাতে অনেক ফিচার কম থাকায় বা ইন্টারনাল মেমোরী বা র‍্যাম-রম ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় অনেকে কম দামে পুরাতন মোবাইল বা সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনে থাকে। 

এসব সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনতে অনেকে পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচার দোকানে গিয়ে থাকে। আবার অনেকে পরিচিত কারো কাছ থেকেও সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনে থাকে। 

সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে অনেক ক্রেতা যেমন সমস্যার সম্মুখিন হয় তেমনি অনেক সময় বিক্রেতাও বড় ধরণের সমস্যায় সম্মুখিন হয়ে থাকে।  

যারা অবৈধ বা চোরাই মোবাইল ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত তাদের থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ক্রয় করার পর অনেককে আইনী জঠিলতার স্বীকার হতে হয়। 

আবার পরিচিত কারো কাছ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ক্রয় করলেও আইনী জঠিলতার স্বীকার হতে হচ্ছে না তেমনটিও নয়।  


নিজের ব্যবহৃত পুরাতন এন্ড্রয়েড মোবাইল বিক্রয় করে সমস্যায় পড়েছে এমন এক জনের কথাই বলি, 

বেশ কিছুদিন আগেকার ঘটনা। একজন কলেজ পড়ুয়া যুবক তার ব্যবহৃত মোবাইলটি পাড়ার এক ছোট ভাইয়ের কাছে বিক্রয় করে এবং বেশি দামে নতুন একটি ভাল মানের এন্ড্রয়েড মোবাইল ক্রয় করে।  

কলেজ পড়ুয়া যুবকটি ব্যবহৃত পুরাতন মোবাইল বিক্রয় করার পর নতুন এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে কিছুদিন বেশ ভালই চলছিল। মাস খানেক পর হঠাৎ কলেজ পড়ুয়া যুবকের ফেসবুক পাসওয়ার্ড আপনাআপনি পরিবর্তন হয়ে গেল, যাতে সে লগইন করতে পারছে না। নিজের ইমো-হোয়াটসঅ্যাপ থেকে তার পরিচিত মেয়ে বান্ধবীর কাছে কল যাচ্ছে, কুরুচি পূর্ণ মন্তব্য করাসহ বিভিন্ন রকমের সমস্যার সৃষ্টি হতে লাগল। 

একপর্যায়ে অপরিচিত একজন কলেজ পড়ুয়া যুবকের মোবাইলে ফোন করে বলতে লাগল কলেজ পড়ুয়া যুবকের কিছু গোপন ভিডিও তার হেফাজতে আছে। সেগুলি সে অনলাইনে ছড়িয়ে দিবে, যদিনা সে তার কথামত কাজ না করে। কলেজ পড়ুয়া যুবকটি এসব ঘটনায় তাজ্জব বনে গেল। 

কিভাবে তার গোপন ভিডিও অপরিচিত লোকের কাছে যাবে ? 

তার ফেসবুক আইডি পাসওয়ার্ড, ইমো, হোয়াটসএ্যাপ কি কেউ হ্যাক করেছে ? 

সেসব চিন্তা করতে করতে তার মনে পড়ল কিছুদিন পূর্বে বিক্রয় করা মোবাইলের মাধ্যমে কিছু পারসোনাল ভিডিও তার বান্ধবীর নিকট প্রেরণ করেছিল এবং তার বান্ধবীও তার কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেতো ব্যবহৃত মোবাইলটি বিক্রয় করার পূর্বে রিসেট বা ফ্ল্যাস দিয়েছিল। তবে কিভাবে কি হল ? তা ভেবে ভেবে সে কোন কূল-কিনারা পাচ্ছিল না। 

তবে পাড়ার ছোট ভাই যার কাছে সে মোবাইলটি বিক্রি করেছিল সেই কি তার সর্বনাশ করছে ? কলেজ পড়ুয়া যুবকটি পাড়ার ছোট ভাইয়ের সাথে যখন এই বিষয়ে কথা বলল সে জানাল, মোবাইলটি কেনার কয়েকদিন পর সে কিছু লাভে পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচার দোকানে বিক্রয় করে দিয়েছে। 

এরপর কলেজ পড়ুয়া যুবকটি পাড়ার ছোট ভাই সহ পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচার দোকানে গিয়ে খবর নিয়ে দেখল, দোকানদার সেই ব্যবহৃত মোবাইলটি অন্যের কাছে বিক্রয় করে দিয়েছে। কিন্তু মোবাইলটি যার কাছে বিক্রয় করেছে তার নাম, ঠিকানা দোকানদারের জানা নাই। 

এই ঘটনার পর ছেলেটি নিরূপায় হয়ে এবং মানসম্মান রক্ষায় নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই বিষয়টি প্রাথমিক অবস্থায় থাকায় বড় ধরণের কোন ঘটনা ঘটার পূর্বেই থানা পুলিশ এই বিষয়টি সমাধান করে এবং কলেজ পড়ুয়া যুবক ও তার বান্ধবীর মান সম্মান রক্ষা করে। 

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, কলেজ পড়ুয়া যুবকের সর্বশেষ মোবাইল ক্রেতা ছেলেটিও তার সমবয়সী হবে। সে শখের বসে পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচার দোকান থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইলটি কম দামে কেনার পর মোবাইলটিতে একটি রিকভারী এ্যাপস ডাউনলোড করে। পরবর্তীতে রিকভারী এ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইলটির ডাটা রিকভারী দেয়। এসময় প্রথম ব্যবহারকারীর মোবাইলে পূর্বে থাকা ফেসবুক আইডি, জীমেইল আইডি, ইমো, হোয়াটসএ্যাপ সহ বিভিন্ন ফোন নাম্বারগুলি পুনরায় মোবাইলে চলে আসে। 

সেই ছেলেটি কৌতুহল বশত পূর্বের ব্যবহারকারীর ইমো, হোয়াটসএ্যাপগুলির ভিতর প্রবেশ করে এবং প্রথম মোবাইল ব্যবহারকারীর বিভিন্ন অন্তরঙ্গ ছবি, ভিডিও সে দেখতে পায়। এসময় তার মনে অপরাধ প্রবণতা জাগ্রত হয় এবং যার ছবি ও ভিডিও তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে বলে সে জানায়।

তাই নিজের ব্যবহৃত মোবাইল অন্যের কাছে বিক্রয় করেও যে চিন্তামুক্ত থাকবেন তা নয়। 


এবার আসি সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল বা পুরাতন মোবাইল কেনার পর কি কি সমস্যার সম্মুখিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে-

পুরাতন মোবাইল বা ব্যবহৃত মোবাইল এমনি এমনি আসে না। অনেকে নতুন মোবাইল কেনার জন্য তার ব্যবহৃত পুরাতন মোবাইলটি কম দামে বিক্রয় করে থাকে। তবে বেশিরভাগ পুরাতন মোবাইল চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে অপরাধীরা সংগ্রহ করে থাকে। অপরাধীরা এসব মোবাইল কিছু কিছু (খারাপ প্রকৃতির) পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচার দোকানে বিক্রয় করে থাকে। এসব খারাপ প্রকৃতির পুরাতন মোবাইল কেনা-বেচা চক্র কিছু কিছু মোবাইলের সোর্স কোড, (IMEI) আইএমইআই কোড পরিবর্তন করে বিক্রয় করে থাকে।

একটি বিষয় মনে রাখা উচিৎ, অপরাধজনক উপায়ে সংগ্রহ করা যেকোন সামগ্রি কেনা-বেচা করা ও হেফাজতে রাখা দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই লোভে পড়ে অবৈধ সামগ্রি কেনা-বেচা করা ও হেফাজতে রাখা থেকে বিরত থাকুন। 

এসব পুরাতন মোবাইল অনেকে সরাসরি কিংবা অনলাইন ভিত্তিক পুরাতন সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের এ্যাপসের (যেমন-বিক্রয় ডট কম, সেল বাজার ইত্যাদি) মাধ্যমেও বিক্রয় করে থাকে। 

তাই পুরাতন বা সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কেনার পূর্বে ভালভাবে যাচাই করুন সেটি কোন অপরাধের মাধ্যমে সংগ্রহ করা সেট কিনা ? যদি যাচাই করতে অক্ষম হন কিংবা অধিক দামী মোবাইল অল্প দামে ক্রয় করা লোভে অধিক আনন্দিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যান তবে আপনি ভবিষ্যতে যেকোন সমস্যার সম্মুখিন হতে পারেন বলে আমি মনে করি। 

ইতোমধ্যে অপরাধজনক উপায়ে সংগ্রহ করা সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল অল্প দামে কিনে অনেকে আইনী জঠিলতার স্বীকার হয়েছে। তাই বলছি অনলাইনে হোক বা অফলাইনে হোক যখন দেখবেন খুবই ভাল মানের একটি সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল সেট যখন খুবই অল্প দামে কেউ বিক্রয় করতে চাইবে তখনই বুঝবেন এরমধ্যে কোন ঘাবলা আছে। 

শুধুমাত্র সেকেন্ড হ্যান্ড এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনলেই যে আইনী জঠিলতায় জড়াতে পারেন তা নয়, সেকেন্ড হ্যান্ড ফিচার ফোন বা কীপ্যাড মোবাইল ফোন কিনেও আইনী জঠিলতায় জড়ানোর সম্ভাবনা বিদ্যমান।  

সচেতনতার জন্য সাধারণ একটি ঘটনা বলি, পুরাতন মোবাইল কিনে কিছুদিন বা কয়েক মাস বা বছর ব্যবহারের পর দেখা গেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেই মোবাইলটি অবৈধ উপায়ে সংগ্রহ করা মোবাইল বলে মোবাইলের বর্তমান ব্যবহারকারীকে জানায় বা চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু চ্যালেঞ্জের জবাবে মোবাইলের বর্তমান ব্যবহারকারী সেই মোবাইলটি কার কাছ থেকে কিনেছে সেটা মনে করতে পারে না কিংবা তার পরিচয় রাখেনি কিংবা মোবাইল কেনার কোন রশিদও সে দেখাতে পারছে না। তখনই পুরাতন মোবাইল কেনার ঝামেলা কি সে বুঝতে পারে। 

যেহেতু আমাদের দেশে সবার আর্থিক অবস্থা এক নয়, সেহেতু অনেকে কম দামে পুরাতন বা সেকেন্ড হ্যান্ড এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনবে এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু পুরাতন বা সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল যে উপায়ে হোক কিংবা যার কাছ থেকে হোক ক্রয় করার পূর্বে যার কাছ থেকে মোবাইলটি কিনছে তার সঠিক নাম, ঠিকানা বা পরিচয় জেনে নিতে হবে এবং মোবাইলটি সে কিভাবে কার কাছ থেকে কিনেছিল তা জেনে নিতে হবে। 

মোবাইলটির ক্রয়ের রশিদসহ কেনার চেষ্টা করতে হবে। 

মোবাইলটি নিয়ে কোন আইনী জঠিলতা আছে কিনা তাও জেনে নিতে হবে। 

প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি মোবাইল বিক্রয়ের চুক্তিনামা সম্পাদন করে নেয়া উচিৎ। 

এসব বিষয় খুবই জঠিল মনে হচ্ছে তাই না ?

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নিজেকে আইনী জঠিলতা মুক্ত রাখতে এসব করা সময়ের দাবী। কারন যদি কখনো আইনী জঠিলতার স্বীকার হতে হয় এসব আপনার পক্ষে কাজে আসবে। 

পরিশেষে বলব, পারত পক্ষে সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ক্রয় না করা বা নিজের ব্যবহৃত এন্ড্রয়েড মোবাইল বিক্রয় না করা বুদ্ধিমানের কাজ। নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী জীবন ধারণ করাই উত্তম। নিজের সামর্থের বাইরে গিয়ে কোন কিছু করা উচিত নয়।

পোস্টটি ভাল লাগলে সচেতনতার জন্য শেয়ার করুন।

ধন্যবাদ। 

Comments

Popular posts from this blog

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কি জেনে রাখুন।

মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে সচেতনতা ও করণীয় কি।

ফেসবুক বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কি করবেন।